সুনামগঞ্জের লাখো মানুষের পুণ্যস্নান
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রী শ্রী অদ্বৈতাচার্য মহাপ্রভুর জন্মধাম সংলগ্ন যাদুকাটা নদী তীরে লাখো পুণ্যার্থী মহাবারুনী গঙ্গাস্নান সম্পন্ন করেছেন। মধুকৃষ্ণা ত্রয়েদশী তিথিতে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ভোর ৫টা ৫৩ মিনিট থেকে ৮টা ৩৭ মিনিট পর্যন্ত যাদুকাটা নদীর তীরের রাজারগাঁও শ্রী শ্রী অদ্বৈত জন্মধাম মন্দিরে পূজা, প্রার্থনা ও নদীতে তর্পণ ও মহাবারুনী গঙ্গাস্নান করেন।
বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পুণ্যলাভের জন্য এটি সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান। কথিত আছে, ‘সবতীর্থে বার বার, পণাতীর্থে একবার’ এখানে একবার গঙ্গাস্নান করতে পারলে সব পাপ মোছন হয়ে যায়। স্নানোৎসবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখো পুণ্যার্থী এসেছিলেন বলে জানিয়েছেন শ্রী শ্রী অদ্বৈত জন্মধাম মন্দির পরিচালনা কমিটি।
এদিকে পুণ্যার্থীদের নিরাপদে চলাচল ও মহাবারুনী স্নানোৎসব সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। কোথাও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, আনুমানিক ১৪৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মাঘ মাসে শ্রী শ্রী অদ্বৈত আচার্য তাহিরপুর উপজেলার লাউড় পরগনার অন্তর্গত নবগ্রামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বহু আগেই নবগ্রাম যাদুকাটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে অদ্বৈত আচার্য মহাপ্রভুর মন্দির গড়ে উঠেছে নবগ্রাম সংলগ্ন রাজারগাঁওয়ে। ‘অদ্বৈত প্রকাশ’ উল্লেখ রয়েছে, একদিন রাত্রিতে অদ্বৈত মহাপ্রভুর জননী শ্রী নাভাদেবী স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি নানা তীর্থ জলে স্নান করছেন। প্রভাতে তিনি স্বপ্নের কথা স্মরণ করে ও তীর্থ গমনের নানান অসুবিধার বিষয় চিন্তা করে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। এমন সময়ে তার পুত্র অদ্বৈতাচার্য সেখানে উপস্থিত হয়ে মাতার বিমর্ষতার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তার মা তাকে স্বপ্ন দর্শনের কথা অবহিত করেন এবং তীর্থযাত্রায় অপারগতার কথা প্রকাশ করেন।
অদ্বৈতাচার্য মাকে বিষণ্ন দেখে পণ করলেন যে, এই স্থানেই সকল তীর্থের আবির্ভাব করাবেন। এরপর শ্রী অদ্বৈতাচার্য মন:শক্তির অসীম প্রভাব ও যোগবলের অসাধারণ শক্তিতে তীর্থসমূহকে আকর্ষণ করে লাউড়ের এক শৈলের উপর আনয়ন করেন। অদ্বৈত জননী তাতে স্নান করে পরিতৃপ্তা হলেন। এইভাবে এই তীর্থের উৎপত্তি হয়। শ্রী অদ্বৈতাচার্যের ন্যায় তীর্থসমূহও পণ করেছিলেন যে, প্রতি বছর মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে এই স্থানে তাদের আবির্ভাব হবে। এই পণ শব্দ থেকেই তীর্থের নাম হয়েছে পণাতীর্থ।
টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে পণাতীর্থে এসেছিলেন বিজন দেবনাথ। তিনি বলেন, ‘পণাতীর্থে এসে যাদুকাটা নদীতে গঙ্গাস্নান করেছি। পূর্ব পুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় শ্রী শ্রী অদ্বৈতাচার্য মহাপ্রভুর জন্মধাম মন্দিরে পূজা ও প্রার্থনা করেছি। খুব সুন্দর জায়গা, পরিবেশও ভালো। এখানে সবারই আসা উচিত।’
কিশোরগঞ্জ পৌর শহর থেকে এসেছিলেন গৌর ভক্ত দাস। তিনি বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে পণাতীর্থে এসেছিলাম। গঙ্গাস্নান করেছি, পূর্ব পুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেছি। এখানে এসে আমাদের মনটা অনেক ভালো হয়েছে। যেহেতু আমাদের দেশের বড় একটা তীর্থস্থান এখানে সকল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের যাওয়া প্রয়োজন।’
শ্রী শ্রী অদ্বৈত জন্মধাম মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখো পুণ্যার্থী গঙ্গাস্নান, পূজা ও প্রার্থনা সম্পন্ন করেছেন। পবিত্রতার সঙ্গে মহাবারুনী গঙ্গাস্নান সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি মন্দিরের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করেছেন।’
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, ‘জাদুকাটা নদীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের স্নানোৎসব সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। সড়কে যানজট নিরসনের ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন ছিল। সুন্দরভাবে স্নানোৎসব সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোন ঝামেলা হয়নি।’